July 11, 2026, 4:27 pm
টেকসই উন্নয়নে পরিবেশ-প্রতিবেশ ও শিল্পায়নের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা একান্ত জরুরি। এ লক্ষ্যে শিল্পায়ন পরিকল্পনায় পানি, বায়ু, বন-বাস্তুসংস্থানসহ প্রাকৃতিক সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন দেশের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য সংগঠনের ব্যবসায়ী নেতারা।
শনিবার (২৯ এপ্রিল) রাজধানীর একটি হোটেলে আরণ্যক ফাউন্ডেশন আয়োজিত ন্যাচারাল রিসোর্সেস কনজারভেশন: স্কোপ অব প্রাইভেট সেক্টর এনগেজমেন্ট শীর্ষক কর্মশালায় তারা এ প্রতিশ্রুতি দেন। তবে পরিবেশবান্ধব শিল্পায়নে সরকারি প্রণোদনা দেওয়া জরুরি বলে মন্তব্য করেন তিনি। এছাড়াও পরিবেশবান্ধব কারখানায় উৎপাদিত তৈরি পোশাকের বাড়তি দাম দেওয়ার জন্য বৈশ্বিক ক্রেতাদের প্রতি আহ্বান জানান উদ্যোক্তারা।
আরণ্যক ফাউন্ডেশন বাস্তবায়িত ইউএসআইডির গ্রিন লাইফ প্রকল্পের আওতায় এ কর্মশালার আয়োজন করা হয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইউএসআইডি বাংলাদেশের ইকোনমিক গ্রোথ অফিসের পরিচালক ড. মুহাম্মদ খান।
তিনি বলেন, ১৯৯০ থেকে প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় ইউএসআইডি কাজ করে যাচ্ছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যক্তিখাতের অবদানের কথা স্মরণ করে তিনি জানান, বেসরকারি খাতের বিকাশের ফলেই বাংলাদেশের বিদেশি সাহায্য নির্ভরতা কমেছে। কর্মশালায় উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ ও তাদের মতামত দেশের জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, পানি, বায়ু ও মাটি দুষণের কেন্দ্রে বনের অবক্ষয়। বন সংরক্ষণ করতে পারলে পরিবেশ ও প্রতিবেশের অনেক সংকটের সমাধান মিলবে। এ লক্ষ্যে ব্যক্তিখাতের সক্রিয় উদ্যোগ আশা করেন তিনি।
এর আগে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিকেমএইএ ও বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সাবেক সভাপতি মো. ফজলুল হক বলেন, পরিবেশবান্ধব কারখানা স্থাপন করে তিনি সামাজিক স্বীকৃতি পেয়েছেন। কিন্তু ব্যবসার মুনাফার ক্ষেত্রে কোনো ইতিবাচক প্রভাব পড়েনি। বরং উৎপাদনের খরচ বেড়েছে। যা ব্যবসাকে কঠিন করে তুলেছে। তাই প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণে উদ্যোক্তাদের আরও বেশি সম্পৃক্ত করতে সরকারের পক্ষ থেকে প্রণোদনার দাবি করেন তিনি। একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব কারখানায় উৎপাদিত পণ্যের বাড়তি দাম দেওয়ার ব্যাপারে ক্রেতাদের প্রতি আহ্বান জানান।
বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন বিজিএমইএ’র সহ-সভাপতি মো. শহীদুল্লাহ আজীম। তিনি জানান, বর্তমানে পরিবেশবান্ধব তৈরি পোশাকের জন্য আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশ সবচেয়ে পছন্দের বাজার। বর্তমানে দেশে ১৯৫টি লিড সনদধারী পোশাক কারখানা রয়েছে বলে জানান তিনি।
মো. শহীদুল্লাহ আজীম বলেন, প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা দেশের প্রত্যেকের দায়িত্ব। পরবর্তী প্রজন্মকে একটি পরিচ্ছন্ন পৃথিবী উপহার দিতে বিজিএমইএ ফোর আর বা রিইউজ, রিডিউস, রিসাইকেল, রিকভার ধারণা বাস্তবায়ন ও তাপ ব্যবস্থাপনা নিয়ে করছে বলেও জানান বিজিএমইএ’র সহ-সভাপতি।
গেস্ট অব অনারের বক্তব্যের বিএসআরএম’র হেড অব ব্র্যান্ডিং ফারাহ শাহরুখ রাজা জানান, তার প্রতিষ্ঠান পরিবেশের কথা চিন্তা করে পণ্য উৎপাদন প্রক্রিয়ার নকশা করেছেন। তারই অংশ হিসেবে বর্জ্যকে পণ্যে পরিণত করা হচ্ছে। অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিও একই আহ্বান জানান তিনি।
এর আগে স্বাগত বক্তব্যে আরণ্যক ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক রকিবুল হাসান মুকুল বলেন, টেকসই উন্নয়নে পরিবেশ ও ব্যবসায়িক মুনাফা চর্চার মধ্যে সমন্বয় আনা জরুরি। দুষণ বন্ধে নতুন নতুন ধারণা নিয়ে বাংলাদেশে এখন অনেক প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। সবার সম্মিলিত প্রয়াসে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও বাস্তসংস্থান সবকিছুর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে জলবায়ু সংকটের মোকাবিলা করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
কর্মশালার সমাপনী বক্তব্যে ইউএসআইডি’র ইকোনমিক গ্রোথ অফিসের পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ শাহাদাত হোসাইন শাকিল বলেন, তাপমাত্রা বাড়লে কিংবা উপকূলীয় অঞ্চল প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্লাবিত হলে ব্যবসাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তাই ব্যবসা বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধির জন্যও পরিবেশকে ঠিক রাখা জরুরি। দেশের পাশাপাশি, ব্যবসায়ীদের আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলেও প্রণোদনা খোঁজার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ভলান্টারি কার্বন মার্কেটে ট্রেডিং করে প্রণোদনা পাওয়া সম্ভব।
এ সময় তিনি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর সিএসআর তহবিল পরিবেশ খাতে ব্যবহারের জন্য আরণ্যক ফাউন্ডেশনকে বিবেচনা করার আহ্বান জানান।
কর্মশালায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আরণ্যক ফাউন্ডেশনের হেড অব প্রোগ্রামস মাসুদ আলম খান। তিনি জানান, প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রায় প্রতি বছরই দেশের চারভাগের এক ভাগ প্লাবিত হয়। এই দুর্যোগের পরিমাণ ও তীব্রতা না কমাতে পারলে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগিত ধরে রাখা সম্ভব হবেনা। এজন্য পরিবেশ ও বাস্তুসংস্থান সংরক্ষণে ব্যক্তি খাতের নিবিড় সম্পৃক্ততা প্রয়োজন। বিশেষ করে ইকো ট্যুরিজম, স্থানীয় জনগোষ্ঠী ভিত্তিক সংগঠনগুলোর সাথে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অংশীদারত্ব স্থাপন, সিএসআর কার্যক্রমের পরিধি বাড়ানোর ব্যাপক সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন মাসুদ আলম খান।
মূল প্রবন্ধের ওপর মুক্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে বাংলাদেশে প্লাস্টিক গুডস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসসোশিয়েশন এর সভাপতি শামীম আহমেদ জানান, বর্তমানে বাংলাদেশের প্লাস্টিক খাত কমলা শ্রেণিভূক্ত। এখাতকে সবুজ শিল্পে পরিণত করতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রিসাইক্লিং করতে কয়েক ধাপে ভ্যাট দিতে হয় জানিয়ে এ কর প্রত্যাহারের দাবি জানান তিনি।
ওয়েল গ্রুপের সিইও সৈয়দ নুরুল ইসলাম বলেন, পরিবেশবান্ধব শিল্পায়নে ব্যক্তিখাত প্রস্তুত। তবে এক্ষেত্রে সরকারকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।
এফবিসিসিআই’র পরিচালক সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে বলেই প্রকৃতি রুদ্ররূপ ধারণ করছে। তাই প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় ব্যক্তিখাতকে আরও সক্রিয় করতে সরকারি নীতি সহায়তা প্রয়োজন।
প্রকৃতি রক্ষায় বর্তমান প্রজন্মকেও সম্পৃক্ত করার পরামর্শ দেন এফবিস